
তৌহিদ টিটুঃ মতলব দক্ষিণ (চাঁদপুর): মতলব বাজার একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক জনপদ। এক সময় নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত এই জনপদের ইতিহাস রয়েছে শতবর্ষের। এককালের বৈরাগীর হাট পরবর্তীতে জমিদার ‘মতলুব খাঁ’-এর নামে নামকরণ হয় এবং ১৯১৮ সালে সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। ২০০০ সালে মতলবকে প্রশাসনিকভাবে উত্তর ও দক্ষিণ—দুই ভাগে ভাগ করলে মতলব বাজার মতলব দক্ষিণ উপজেলার মধ্যে পড়ে।
আজ সেই মতলব বাজার পড়েছে অবহেলার চরম সংকটে। বাজারে গড়ে উঠেছে আধুনিক ব্যাংক, প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিক ও শপিং কমপ্লেক্স। বাজারকে বাইপাস করে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। এমনকি মতলব শাহী জামে মসজিদ ও শ্রী জগন্নাথ মন্দিরও পেয়েছে আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়া। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, বাজারটির রূপ আজও আগের মতোই রয়ে গেছে—যেখানে দুটি গাড়ি একসঙ্গে চলতে পারে না, যেখানে হারিয়ে গেছে এক সময়ের প্রাণকেন্দ্র পোস্তা ঘাট, ধানের গালা, ফজর আলী সরকারের ঘাট, খাল ও কাঠবাজার।
ব্যবসায়ীরা জানান, ধনাগোদা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এ বাজারটি নদীপথে ভূষিমাল, মাছ, রড, সিমেন্ট, মিষ্টি, ক্ষীর ও অন্যান্য নিত্যপণ্য পরিবহনের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পোস্তা ঘাট, ধানের গালা, ফজর আলী সরকারের ঘাট, রথ বাজার ও কাঠবাজার ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে সরগরম থাকত সব সময়। যদিও মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প চালুর পর নদীপথের বাণিজ্য কমেছে, কিন্তু এখনও তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি। সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে বাজারের মূল রাস্তাগুলো অত্যন্ত সরু থাকায় প্রতিনিয়ত মালামাল পরিবহনে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। পাশাপাশি, ভূমি অফিসের দক্ষিণ পাশের খাল (কাঠবাজারের সঙ্গে সংযুক্ত), থানার পশ্চিম পাশের খাল এবং রথ বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত বাজারের পূর্ব পাশের খাল কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মতলব পূর্ব বাজারের একটি বিশাল অংশ অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। অথচ পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলেই এই জায়গাটি হতে পারে বাজারের প্রাণকেন্দ্র। রড, সিমেন্ট ও হার্ডওয়্যার দোকানগুলোকে পূর্ব বাজারের অবহেলিত অংশে স্থানান্তর করলে তা পরিণত হবে একটি ‘বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস হাব’-এ। পাশাপাশি, ফল বা মোবাইলের দোকানগুলোর জন্য আলাদা থিমভিত্তিক মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
তারা জোর দাবি জানিয়েছেন—রিকশাস্ট্যান্ড থেকে মতলব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, চেয়ারম্যান ঘাট (গুদারা ঘাট), টিনপট্টি, ধানের গালা, রথ বাজার হয়ে রিকশাস্ট্যান্ড পর্যন্ত (রিং রোড) রাস্তাটি সম্প্রসারিত করতে হবে। পাশাপাশি, রিকশাস্ট্যান্ড থেকে ফলপট্টি হয়ে মাদ্রাসা-শাহী জামে মসজিদ হয়ে রথ বাজার এবং ব্রয়লারপট্টি হয়ে চেয়ারম্যান ঘাট পর্যন্ত রাস্তা প্রশস্ত করতে হবে, যাতে করে অনায়াসে দুটি গাড়ি ক্রস করতে পারে। বর্তমানে বাজারের রাস্তা এতটাই সরু যে, দুই পাশ থেকে আসা রিকশা কিংবা অটোরিকশা আটকে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী অজয় সাহা জানান, “পণ্যবোঝাই ট্রাক বাজারে ঢুকতে পারে না, তাই আমাদের পণ্য খালাস নিয়ে হিমশিম খেতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে তো দশা আরও খারাপ—কার্গো থেকে মালামাল খালাস করতে খুবই অসুবিধা হয়, আলাদা পাকা জেটি না থাকায়। বাজারে পিকআপ নিয়ে ঢুকতে সমস্যার কারণে অনেক বড় বড় অর্ডার আমরা হাতছাড়া করি।”
রড, সিমেন্ট, হার্ডওয়্যার, পাইকারি কাঁচামাল, ফলমূল বা মোবাইলের দোকানগুলোকে অবহেলিত পূর্ব বাজারে স্থানান্তর করলে তা পরিণত হবে একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক আর্থিক ব্যবসাকেন্দ্রে। রাস্তার ওপর থেকে দোকানপাট সরিয়ে ফুটপাত নির্মাণ, একটি শিশু পার্ক এবং বাজারের উত্তরে ধনাগোদা নদীর তীরে রিভারফ্রন্ট ওয়াকওয়ে নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী ……… বলেন, “আমরা চাই না মতলব বাজারের ঐতিহ্য শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকুক। আধুনিকায়নের এই যুগে যদি বাজারকে সুপরিকল্পিত করা যায়, তাহলে বাড়বে ব্যবসা-বাণিজ্য, বাড়বে কর্মসংস্থান, বদলে যাবে গোটা জনপদের চিত্র।”
স্থানীয় সাংবাদিক ফজলে রাব্বী ইয়ামিন কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শুধু কথা বলে লাভ নেই। প্রতিবছর উন্নয়ন বরাদ্দ হয়, কিন্তু আমাদের মতলব বাজারের জন্য তা কোথায় যায়? চেয়ারম্যান ঘাট থেকে রিকশাস্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তাটি সরু ও জীর্ণ, কিন্তু এ নিয়ে প্রশাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।” তিনি আরও বলেন, “আগামী প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত মতলব বাজারের আধুনিকায়নে ‘মাস্টার প্ল্যান’ গ্রহণ করা এবং তা বাস্তবায়ন।”
সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী সমিতির প্রতি এলাকাবাসীর জোর আবেদন—ঐতিহ্য ধরে রেখে মতলব বাজারের আধুনিকায়নে এখনই নেওয়া হোক কার্যকর পদক্ষেপ। নইলে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে পারে এই জনপদের বাণিজ্যিক ঐতিহ্য।
